Moushumi Bhowmik, singer and writer, initiated this journey through folk music in Bengal She has conceptualised this site, with sound recordist Sukanta Majumdar

‘Accuse’ কাকে করবো?

by মৌসুমী ভৌমিক.
This essay comes as a response to a post on Facebook after the death of the singer and composer Kalikaprasad Bhattacharya. The post opened up complex and problematic questions of the appropriation of folk music by mainstream media, of divided Bengal and the hegemony of West Bengal, of the capitalisation of folk music, maintaining ‘purity’ of dialect and diction while singing, and so on. Questions which concern our work too, but for which we do not have conclusive answers. I am glad these questions were raised, and raised by someone young, confident and caring. I wanted to make an attempt to write about our own nuanced take on some of these questions, which we too have to deal with, as practitioners. The title translates as Whom Shall We Accuse? Moushumi Bhowmik, Kolkata, 21 March 2017.

অপরাজিতা নক্ষত্র কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য্যর মৃত্যু, লোকগান, ভারতের টেলিভিশনে সিলেটের লোকগানের appropriation, উচ্চারণের বিশুদ্ধতা এবং বিকৃতি, দেশবোধ, ইত্যাদি নানা বিষয়ে একটা লেখা লিখেছেন ফেসবুকে (https://www.facebook.com/aporajeeta.nakshatro), তাতে আমার উল্লেখও আছে। তারপর আরো একটা লেখা। আমি ঘটনাচক্রে প্রথম লেখাটা পড়েছি আর তার উত্তরে প্রত্যুত্তর, মন্তব্য, সমর্থন, ভাললাগা, ভাল না লাগা, রাগ, ক্ষোভ প্রকাশের জোয়ার–অজস্র মানুষের, তাদের মধ্যে কিছু নাম আমার পরিচিত আর বেশির ভাগই অজানা।

এই গোটা বিষয়টা গত ক’দিন ধরে আমার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে; আর আমার ভিতরেও কিছু কথা জমে উঠছে। আমাকে অবশ্যই কেউ মাথার দিব্যি দেয়নি এই লেখা লিখতে, বস্তুত কেন আমি তিন দিন জরুরি কাজ ফেলে এই লেখাটার কথা ভেবেই চলেছি, তা আমি নিজেও জানি না। তবু, কী একটা compulsion যেন ক্রিয়া করছে ভিতরে। হয়ত অপরাজিতার লেখা এবং সেই সংক্রান্ত আলোচনায় এমন অনেক কথা উঠে এসেছে যা আমাকেও ভাবায়। আর এই আলোচনা আমার মধ্যে একটা উদ্বেগেরও জন্ম দিয়েছে, some kind of an unidentifiable anxiety.

আমাকে একটা সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিক থেকে কালিকার মৃত্যুর পর ওর কাজের কথা লিখতে বলেছিল, আমি লিখিনি। কারণ, কালিকা আমার extended বন্ধু-জগতের একজন ছিল, আমরা কোনোদিনই সহকর্মী ছিলাম না। আমার টেলিভিশন চলে না, আমি কোনোদিন সহজ পরবেও যাইনি (তার মানে একেবারেই এই নয় যে সহজ পরব খারাপ আর আমি ভাল; just যাইনি, যেমন আমরা অনেক জায়গায় যাই না, যাওয়া হয় না)। দোহার আমি শুনেছি অবশ্যই, কখনো কোথাও কোনো বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে উদ্ধৃতিও দিয়েছি। কিন্তু লাইভ কেবল একবারই শুনেছিলাম, তখন আমি বিদেশে থাকতাম আর বাড়ি এসে একবার শুনলাম ‘দোহার’ হয়েছে, আর ‘ভূমি’, আর আমিও খানিক updated হতে দোহারের গান শুনে এলাম শিশির মঞ্চে গিয়ে। সেসব অনেক কাল আগের কথা। সেই অনুষ্ঠানে বন্ধুদের ভিড় ছিল। নয়ের দশকে যেমন সুমনের অনুষ্ঠানে বন্ধুদের সঙ্গে বন্ধুদের দেখা হয়ে যেতো, তেমনি সেদিন অনেকের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। গান শুধু গান ছিল না, একটা communal gathering ছিল। তাকেই বন্ধু-জগত বলছি। আর কালিকা তার ভিতরে ছিল বলেই ২০০৫-এ, প্রথমবার ফিল্ড রেকর্ডিং-এর কাজে শিলচরে গেলে ও আমায় ওর বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিল। সেবার কালিকার ভাই মিঠু আর বন্ধু শুভ একটা গান গেয়েছিল, উমার গান, ‘জুড় করি ঐরাবত’ আর আমি ওদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, আমি এই গানটা গাইব? তো ওরা তখন হেসে বলেছিল, গাইবে না কেন? গানটা কি আমাদের? আর বারীন্দ্র দাশ বলে একজন এসেছিলেন, সঞ্জীব নস্কর–এখন সব মনে পড়ে যাচ্ছে। বারীন্দ্র ঠিক প্রোফেশনাল গাইয়ে হয়ত ছিলেন না; খুব দরদ দিয়ে একটা গান গেয়েছিলেন, তাতে একটা লাইন ছিল: ‘যাত্রা হব যাত্রাকালে, কেউ যাবে না আমার সাথে, গুরু, অসময় দেখি’। অদ্ভুত লাগছে এখন কথাটা ভাবতে। কালিকার মৃত্যু আমাকে তারেকের যাত্রাকাল মনে করিয়ে দিয়েছে।

২০০৫-এর সেই শুরুটা নিশ্চয় জরুরি ছিল, কিন্তু শুরুতে আমরা আটকে থাকি না তো। গাছ গাছের নিয়মে পল্লবিত হয়। গত দশ বারো বছরে কত কিছু হলো আমাদের ব্যক্তিগত আর সমাজ-জীবনে। আমাদের এক একজনের জীবন এক এক দিকে ধাবিত হলো। তখন কখনও পথে দেখা, কেমন আছেন মৌসুমীদি? এইটুকুই। অথবা, পাড়ার মিষ্টির দোকানে মেয়ে মিষ্টি খাচ্ছে আর কালিকা দাঁড়িয়ে আছে–বেচারার ডায়াবেটিস; সেও অনেক দিন আগের কথা, এখন হয়ত আর দাঁড়াতেই পারতো না, লোকে উত্তক্ত করতো। টেলিভিশন একটা অন্য ব্যাপার। আমার টেলিভিশন না থাকলেও ‘সারেগামা’ কানে আসবেই, কেউ আটকাতে পারবে না। আর টিভি মানুষকে টানবেই। এই কা’দিন আগে যাদবপুরে মিলনদার ক্যান্টিনের সামনে ঘুরঘুর করতে দেখলাম তীর্থকে, সাত্যকি পরিচয় করিয়ে দিলো, তারপর জয়রাজ ভট্টাচার্য্যের একটি উত্তরাধুনিক সামাজিক পালা নাটকে দোতারা বাজাতে দেখলাম, সেই নাটক ক’টা লোকই বা দেখতে গেছে! আমার মা তো অবশ্যই যাননি। ক’দিন পরে মায়ের মুখেই শুনি তীর্থর নাম–ও ‘সারেগামা’য় খুবই নাকি ভাল করছে। আর সেদিন শক্তিগড়ের বাউল ফকির উৎসবে হ্যারেম প্যান্টস্ পরা, সুর্মা টানা চোখের ছেলেটা আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো আর আমিও হাসলাম কিন্তু মনে মনে ভাবছি, কে যেন? একজন বললো, ও তো তীর্থ! মিডিয়া, বিশেষ করে audiovisual media, শিল্প, শিল্পী এবং দর্শক/শ্রোতা–সব কিছুকেই অন্য রূপে দেখার এবং দেখাবার/শোনাবার ক্ষমতা রাখে, তার থেকে মুক্তি নেই। আমি ঘরে টিভি চালাই না, সে নেহাতই আমার উদাসীনতা/উন্নাসিকতা/আলস্য, আমি জানি। তাতে এই বিরাট ভুবনের কিসুই যায় আসে না। কিন্তু, গানের রিয়্যালিটি শো শুধু যে পশ্চিমবঙ্গের phenomenon তা একেবারেই নয়। আজ থেকে দশ বছরেরও বেশি আগে, ২০০৬-এ রংপুরে অঞ্চলের দেবীচরণ গ্রামে আমরা বিপিন চন্দ্র রায় বলে একজনকে রেকর্ড করেছিলাম, খুবই মিষ্টি করে গান গেয়েছিলেন সেই যুবক, কিন্তু রংপুরের গান না, নেত্রকোণার সাধক-কবি উকিল মুন্সির একটা গান, ‘আমার গায়ে যত দুঃখ সয়’। বিচ্ছেদ গানের ধার তাতে ছিল না, যেমন ছিল দেবেন ভট্টাচার্য্যের ফিল্ড রেকর্ডিং-এর অ্যালবাম, River Songs of Bangladesh-এর অন্তর্গত মহম্মদ জসিম উদ্দীন হীরুর গাওয়া একই গানে। বিপিনের গানের trajectory খুঁজতে গিয়ে আমি বুঝতে পেরেছিলাম কেমন করে সেই গান বারি সিদ্দিকির রেকর্ড থেকে টেলিভিশনের রিয়্যালিটি শো’র স্টার, নোলক হয়ে দেবীচরণের এই অপরিচিত শিল্পীর কাছে গিয়ে পৌঁছেছিল। পথে আসতে আসতে গানের ধার কমে গেছে, সেন্টিমেন্ট্যালিটি বেড়েছে। তবে মিডিয়ারও বড় ভাই, ছোটভাই নিশ্চয় আছে, দাদাগিরি আছে। সুনামগঞ্জের শাল্লা অঞ্চলের ঘুঙ্গিয়ার গাঁও গ্রামে একটা ছোট্ট দোকানে একটা ছোট্ট টিভি, তাকে ঘিরে কত মানুষ স্টার জলশায় ইষ্টিকুটুম বলে কোনো সিরিয়াল দেখছেন–এমন দৃশ্য আমরাই দেখেছি। তখন নিশ্চয় বিটিভি বা চ্যানেল আই-এ কিছু না কিছু হচ্ছিল, কিন্তু সেদিকে খুব একটা মন ছিল না কারো।

অপরাজিতা বার বার করে বর্ডার টেনে কথা বলেছেন–আমি ‘আমাদের’ জন্য লিখেছি এই লেখা, পশ্চিমবঙ্গের জন্য না, পশ্চিমবঙ্গের মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন যদি না যিনি মন্তব্য করছেন, তিনি আমার দেশের ডায়াস্পরা হন ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু যে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে বলেছেন, তাতে বর্ডার টানা কঠিন, যদি না তেমন কোনো ফিল্টার থাকে, যা দিয়ে কুশিয়ারার এপারে থাকলেই শুধু পড়া যাবে একটা লেখা, ওপারে থাকলে নয়; পাঠক/লেখকের IP address যেখানে ID/পাসপোর্টের কাজ করবে। মনে পড়ে গেল, অনেক কাল আগে, আমার একটা গান ছিল, ‘সংখ্যালঘু’, তাতে এপার ওপারের কথা ছিল। আমি যেখানে বসে গাইতাম, সেই মতন আমার এপার আর ওপার জায়গা বদল করে নিত। তবে, সেই গানে এপার আর ওপার যত সহজেই স্থান পাল্টে নিক না কেন, আসলে যে এপার আর ওপারের দ্বন্দ্ব অত্যন্ত real এবং জটিল, তা আমি জানি এবং মানি। তার কারণ অনেক বছর ধরে এই দ্বন্দ্বের ভিতরেই আমার বাস।

গানের এপার-ওপার

একটা গল্প আমি দেশভাগ, বর্ডার এবং গানের এপার-ওপার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে একাধিকবার বলেছি। গল্পটা এইরকম: আমার বন্ধু ঝুন, ভাল নাম সঞ্চিতা রায়চৌধুরী। ঝুনের বাবা ছিলেন বিখ্যাত লোকগানের শিল্পী, শ্রী রনেন রায়চৌধুরী; তাঁর দেশের বাড়ি ছিল সিলেটে, দেশভাগের সময় কলকাতায় আসেন। রনেন রায়চৌধুরীর গাওয়া ‘মাঝি তোর নাম জানি না’ বা ‘নমাজ আমার হইল না আদায়’ ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আমাদের কাছে এসে পৌছেছিল অনেক কাল আগে, সেই থেকে তা আমাদের অনেকের জীবনে স্থায়ী স্থান করে নিয়েছে। ঝুন নিজেও খুব ভাল গায়, মূলত ওর বাবার কাছে শেখা গান। তো, রনেন রায়চৌধুরীর ঘরে করা একটা রেকর্ডিং-এ ‘ভ্রমর কইয়ো গিয়া’ গানটা ছিল। সিলেটের সাধক-কবি রাধারমনের গান। খুব সম্ভবত ষাটের দশকে, খালেদ চৌধুরী, রণজিত সিংহ, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, নীহার বড়ুয়াদের Folk Music and Folklore Research Institute of Calcutta থেকে করা । সেই রেকর্ডিং কপির কপি, তস্য কপি হয়ে আমার কাছে এসেছিল, বছর পনেরো আগে। রনেন রায়চৌধুরী একভাবে ‘ভ্রমর কইয়ো গিয়া’ গাইতেন। ঝুনের কাছেও আমি সেভাবেই গানটা শুনেছি। এদিকে, আমি যখন প্রথম বাংলাদেশে যাই, সে আরো আগের কথা, ১৯৯৫ নাগাদ, তখন একটা ব্যান্ডের গাওয়া এই গান আমি আমার তখনকার বন্ধু, লেখক শাহীন আখতারের বাড়িতে শুনেছিলাম, আর শাহীন তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বলতো, ‘ড্রাম পিটাইয়া গানটা গাইছে, বেশ লাগে।’ আমারও বেশই লেগেছিল তখন। (সেই ব্যান্ড-এর নামটা যে ঠিক কী ছিল, আমি বলতে পারবো না, কিন্তু তাদের সেই ক্যাসেটে ‘ওগো মা তুমি কেন্দো না, মিলনের রক্তে আমি হটিয়েছি স্বৈরাচারী’ বলে একটা গানও ছিল।) তারপর আমি দোকানে দোকানে ঘুরছিলাম আর নানান ক্যাসেট কিনছিলাম, তার মধ্যে দিলরুবা বলে একজন শিল্পীর গলায় ‘ভ্রমর কইয়ো’ গানটাও ছিল। কয়েকবার শোনার পর গানটা আমার জানা হয়ে গিয়েছিল, নিজে গাই বা না গাই। ফলে, রনেন রায়চৌধুরীর গানটা যখন শুনলাম, আমি দেখলাম সেই গায়ন, ছন্দ, লয় এবং ভাব, সবই অন্যরকম। আমি ঝুনকে সেই কথা বলাতে ও বলেছিল, তুমি যেভাবে গাইছ সেটা ঠিক গাওয়া নয়, আসল গাওয়া হলো বাবা যেমন করে গেয়েছিলেন, সেটা।

২০০৬-এ সুকান্ত (সাউন্ড রেকর্ডিস্ট সুকান্ত মজুমদার) আর আমি প্রথমবার সিলেটে গান রেকর্ড করতে গেছিলাম, তার আগে একবার একলা গিয়ে আমি দু’ একজনের সঙ্গে আলাপ করে এসেছি। কথায় কথায় ‘ভ্রমর কইয়ো গিয়া’র প্রসঙ্গ ওঠে। আমাদের বন্ধু এবং এক অর্থে স্থানীয় অভিভাবক, অম্বরীষ দত্ত এবং বইপত্রের হান্নানভাই (শুভেন্দু ইমাম) আমার গলায় রনেন রায়চৌধুরীর version শুনে বলেন যে, ‘আমরা তো ছোটবেলায় এইভাবেই গানটা শুনতাম!’ সেই আলোচনায় শিল্পী রুহি ঠাকুরও ছিলেন। উনি হান্নানভাই-এর কথায় সায় দিচ্ছিলেন। পরে ওঁর গান রেকর্ড করেছিলাম আমরা। উনি অনেক গানের মধ্যে ‘ভ্রমর কইয়ো গিয়া’ও গাইলেন, কিন্তু সেই গাওয়া ‘বিশখে গো’ বা ‘ঘুমে অচেতন মা’র মতন জোরালো হলো না। হান্নানভাই, অম্বরীষদারাও কথাটা বললেন–এটা আপনি কেমন করে গাইলেন? তাতে রুহিদা বলেছিলেন, আজ কেমন যেন গানটা গুলিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ, এত কথার পর উনি authenticity’র চাপে পড়ে গেছেন; যেভাবে সচরাচর গান, তাও ঠিক ধরে রাখতে পারছেন না, আবার সম্পূর্ণ নতুন ভাবেও গাইতে পারছেন না, পুরনো সময়ের গায়নে ফিরে যেতে পারছেন না।

ফলে, গল্পটা এইরকম দাঁড়ায় যে, রনেন রায়চৌধুরীর গানের রেকর্ডিং-এ যে সময় ধরা আছে, সেই সময়ের অস্তিত্ব ওই রেকর্ডিং-এর মধ্যে আর ঝুন-এর চাওয়ার ভিতরে আর হান্নানভাইদের জেগে ওঠা স্মৃতিতে। ইতিমধ্যে সময় পাল্টেছে, গানের রূপও পাল্টেছে। ঝুন কোনোদিন সিলেটে যায়নি (তখনও পর্যন্ত; পরে গেছে কি না আমি জানি না), তাই বাবার গায়নে ও তাঁর হারানো দেশকে দেখতে পায় এবং সেইভাবেই দেখতে চায়। তাই ঝুন এই পরিবর্তিত গানকে মেনে নিতে পারে না। সত্যি কথা বলতে কি, ও মেনে নিতে না চাইলে নেবে না, ওর কাছে গানটা থাকুক না অপরিবর্তিত হয়ে? শুধু সেই যে পীট সিগার বব ডিলানের ইলেক্ট্রিক গিটারের তার কেটে দিতে গেছিলেন, সেই রকম বাড়াবাড়ি না করলেই হলো! তার বাইরে আমরা যে যার idiosyncrasy নিয়ে থাকতেই পারি, অসুবিধা তো নেই কোথাও। আসলে, নানা রকম শোনা, গাওয়া, বলা, একই সময়ের ভিতরে অনেক সময়ের অস্তিত্ব–এমনটা আছে বলেই কিন্তু এখনো বেঁচে থাকতে মোটের ওপর ভালই লাগে। সময় যেমন linear না, তেমনি একমাত্রিকও না। শ্রবণও আসলে তাই। একই সময়ের মধ্যে এই যে নানা সময় ধরা থাকে, তাকে আমরা কী ভাবে শুনবো?

আরো একটা কথা এই প্রসঙ্গে বলতে হয়, তা রেকর্ডিং নিয়ে। রেকর্ডিং কিন্তু আসলে একটা মুহূর্ত। একটা গানের জীবনে একটা মুহূর্ত। কিন্তু জীবন এবং গান সেই মুহূর্তেই সীমাবদ্ধ নয়। একটা চলমান মৌখিক সংস্কৃতিতে একটা গান সেই রেকর্ডিং-এর আগেও হয়ত ছিল এবং পরেও হয়ত থাকবে। যে মুহূর্তে একটা গান রেকর্ড করা হলো সেই মুহূর্তে তার একটা ছবি তোলা হলো, মুহূর্তটা fixed হয়ে গেল। কিন্তু সেটাই সেই নির্ভুল, authentic moment, যাকে এর পর থেকে আমাদের মেনে চলতে হবে, এমন আসলে বোধহয় না। আমি যদি সেই রেকর্ডিং শুনে গানটা শিখি, তাহলে তার ছাপ পড়বে আমার ওপর। আবার, আর কেউ হয়ত অন্য কোথাও এই একই গান করেন, তাঁকে রেকর্ড করা হয়নি, কিন্তু তিনি তাঁর শরীরে আর স্মৃতিতে গানটাকে বয়ে বেড়ান। তাঁর কাছ থেকে হয়ত গানটির আর কোনো রূপ পাবো। যন্ত্রে করা রেকর্ডিং নিঃসন্দেহে সময়ের খুব মূল্যবান দলিল, কিন্তু সেটা frozen time, একমাত্র আমার শ্রবণে তা প্রাণ পায়। কিন্তু সুর শব্দ মানুষের সমাজে, স্মৃতিতে ধরা থাকে, বইতে থাকে, হারিয়েও যায় জীবনের অমোঘ নিয়মে। আমি ভাবি, হারিয়ে গেলে, যাক! কিছু তো করার নেই। কাউকে তো জোর করে ধরে রাখা যায় না। বিশেষ করে সময়কে।

১৯৩০ -এর দশকে কবি, প্রাবন্ধিক এবং ICS অন্নদাশঙ্কর রায় রাজশাহীর নওগাঁর ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। সেই সময় তাঁর কাছে হল্যান্ডের এক সঙ্গীত গবেষক গিয়েছিলেন, তাঁর নাম ছিল আর্নল্ড বাকে। বাকে’র সঙ্গে একটি রেকর্ডিং যন্ত্র ছিল। তিনি অন্নদাশঙ্করের বাড়িতে থেকে ঐ অঞ্চলের বাউল ফকিরদের গান রেকর্ড করেছিলেন। অন্নদাশঙ্কর রায় পরে লিখেছিলেন যে সাহেবের যন্ত্র ছিল, তাই আমাদের গান তার যন্ত্রে রেকর্ড হয়ে বিদেশে ‘চালান গেল’, আমরা তাকে ধরে রাখতে পারলাম না (অন্নদাশঙ্কর রায়, লালন ফকির ও তাঁর গান। কলকাতা: মিত্র ও ঘোষ, ১৯৯২)। এখন, কথা হচ্ছে এই যে, গানগুলো সত্যি সত্যিই ওই সাহেবদের আর্কাইভেই রাখা আছে। তাতে অবশ্য খুব খারাপ কিছু হয়নি। রইল তো সময়ের শব্দের একটা চিহ্ন!

Zee নিয়ে অপরাজিতার যে ভয় আর সতর্কীকরণ, তার সঙ্গে অন্নদাশঙ্করের গল্পের সবটা মেলে না। কিন্তু যেখানে মিল তা হলো যন্ত্র আর অর্থের আধিপত্যের প্রসঙ্গ। বড় মাছ ছোট মাছকে খেয়ে ফেলছে এবং আরো খেয়ে ফেলবে, তাই সাবধান হও। এতটা আমি বুঝতে পারি, এবং মানতেও আমার অসুবিধা হয় না। কিন্তু যেখানে জাতীয়তাবাদী স্লোগান তোলা হয়, তখন আমার ভয় লাগে। ‘বড় মাছ’ তো আসলে এপারও না, পশ্চিমবঙ্গও না। বড় মাছ তো বাজার। অথচ, ‘আমার গান, আমার দেশের গান’, এইসব বললে জলটা ঘোলা হয়ে যায়। কোন সীমান্তের কথা বলছি আমরা? কত বছরের ইতিহাসের কথা বলছি? কার গান, কে নিয়ে গেল? আজকের উত্তরপূর্ব ভারতে সিলেটপ্রবাসীর বাস কত যুগের? আমি নিজে সিলেটি নই, কিন্তু সিলেট সংলগ্ন শিলং-এ বড় হয়েছি। সেখানে আমাদের আশপাশে বাঙালি বলতে মূলত সিলেটিই বোঝাত। সুনমগঞ্জে বড় হওয়া কোনো যুবকের করিম শাহ’র গানে যদি উত্তরাধিকার থাকে, কাছাড়ে বড় হওয়া কারো থাকবে না? আমাদের রেকর্ডিং-এ যাদব সরকার বলে শিলচরের এক শিল্পী গেয়েছিলেন, ‘করিম নামের সারি গাইয়া যাব তরী বাইয়া।’ করিম নামের তরী কে বাইবে আর কে বাইবে না, কে কীভাবে বাইবে, সেটা কে ঠিক করে দেবে?

প্রসঙ্গ উচ্চারণ

উচ্চারণের প্রসঙ্গটা কৌতূহল জাগায়। ‘লোকগানে যথাযথ উচ্চারণ হতে হবে।’ এ কথা শুধু অপরাজিতার লেখাতেই আলোচিত হয়নি। আমি বহুবার এই কথা বহু মানুষের মুখে শুনেছি। আমার নিজের গাওয়া প্রসঙ্গেও শুনেছি। একবার লন্ডনে ‘কান্দিয়া আকুল হইলাম’ গেয়েছিলাম আমাদের ‘পারাপার’-এর অনুষ্ঠানে (এই গানটা দিয়ে শুরু হয় আমার নতুন অ্যালবামের ‘মাঝি’ গান; সাত্যকি গায়, আমি গলা মেলাই, তারপর ধীরে ধীরে আমার গানে চলে যাই। দ্রষ্টব্য Songs from 26H: Home Recordings of Moushumi Bhowmik, with Oliver Weeks, Satyaki Banerjee and Sukanta Majumdar. Kolkata: Travelling Archive Records, 2017)। পারাপার-এর সঙ্গে গাই যখন, অলি (অলিভার) খুব যত্ন করে দোতারার বাদনকে মনে রেখে গিটার বাজায়, গানের তলায় তলায় চেলো চলে নদীর মতন, ডাবল বেস হাল ধরে থাকে। আমি নিজের স্বাভাবিক উচ্চারণেই সিলেটের কবির গান গাই। আমি মনে করি, আমাদের উচ্চারণ এর চেয়ে বেশি ‘যথাযথ’ হতে পারতো না। এর থেকে বেশি কিছু করলে তা আরোপিত হয়ে যেত। কিন্তু সেই গায়ন অনেকের অনুমোদন পায়নি, পাবে না আমি জানতামও। ব্রিক লেনের এক জাত্যভিমানী সিলেটি লেখেন, ‘ঢাকার [sic] মৌসুমী “শুদ্ধ” উচ্চারণে সিলেটের গান গেয়েছেন।’ এই প্রতিবাদে নানা পুরনো-নতুন দ্বন্দ্ব ফুটে ওঠে: ‘শুদ্ধ’ বনাম সিলেটি, ঢাকা বনাম সিলেট (আমি ঢাকার নই, ওপারের, সে কথা জানলে কী লিখতো কে জানে?), ব্রিক লেন-এর অন্তর্দ্বন্দ্ব–কার ব্রিক লেন, কে নিয়ে নিল–এসবও এই আপত্তির ভিতরে ধরা থাকে।

‘লোকগানে’ ‘যথাযথ’ উচ্চারণ হতে হবে–এটা একটা চিন্তার স্কুল নিঃসন্দেহে। এখন, ‘লোক’ই বা কী, আর কোনটা যে ‘যথাযথ’? এরকম বিচারের অনেক নিয়ম আছে–কী কী চিহ্ন থাকলে একটা গান ‘লোক’ হয়, সেই প্রশ্নের সঙ্গে সময়, স্থান এবং শিল্পী ও শ্রোতার অবস্থান–ভৌগোলিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, শ্রেণী, লিঙ্গ–সব ধরনের অবস্থান–সব কিছুরই যোগ আছে। এহেন বিচার ব্যক্তিগতও। কালিকার মৃত্যুর পর শিল্পী ও গবেষক রঙ্গিলী বিশ্বাস (পিতা স্বনামধন্য শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাস) এক জায়গায় লিখেছেন কালিকার বিশুদ্ধ (impeccable) উচ্চারণের কথা। ওঁর গলায় রঙ্গিলী, ‘provenance’ অথবা শিকড়/জন্মসূত্র শুনেছেন। (http://www.wionews.com/south-asia/kalika-prasad-bhattacharya-songs-from-silchar-with-love-13359)। আমার কেবল মনে হয়, এইভাবে বিচারের ফলে ‘উচ্চারণ’ শব্দটার আর একটা যে অর্থ, যাকে ইংরেজিতে utterance বলা যায়, যার সঙ্গে একটা গানের গান হয়ে ওঠার সম্পর্ক, সেই অর্থটা যেন খানিক হারিয়ে যায়; যদি আমরা শুধু phonetically বিষয়টাকে দেখি। উপরোক্ত আর্নল্ড বাকে রবি ঠাকুরের গান গেয়ে রেকর্ড করেছিলেন ১৯৩০-এ। ‘মেঘের পরে মেঘ’, ‘তোর ভিতরে জাগিয়া কে রে’–এইসব গান ওঁর গলায় শুনে আমার অন্তত এমন একটা তৃপ্তি হয়, সেখানে তিনি কী ভাবে কোন শব্দ উচ্চারণ করছেন, সেই খণ্ডের বিচার তাৎপর্য হারায়। বাকের উচ্চারণ আমায় মুগ্ধ করতে পারে তখন। এরকম দীর্ঘ তালিকা দেয়া যায়–ভীমসেন যোশী ‘হৃদয় বাসনা পূর্ণ হলো’ গেয়েছিলেন; সেই গান শোনাও, ইংরেজিতে যাকে বলে একটা blessing.

আমি নিজেকে সম আসনে একেবারেই বসাচ্ছি না, তবু আমারও একটা গল্প আছে। রনেন রায়চৌধুরীর সেই যে হোম রেকর্ডিং, তাতে আরো একটা গান ছিল, ‘দয়া নি রাখিবায় মোরে, প্রাণনাথ, মায়া নি রাখিবায় মোরে’। আমায় গানটা বিঁধেছিল প্রথম শোনাতেই। ফলে গাইতে শুরু করি, নিজের উচ্চারণেই। কোন অবচেতনে দয়া আর মায়া স্থান পরিবর্তন করে ফেলে, আমার গানটার নাম ‘মায়ানি’ হয়ে যায়। আমি খেয়াল করি, কিন্তু দয়া আর মায়াকে পুনরায় তাদের যথাস্থানে স্থাপিত করতে পারি না। মায়াই আমার কাছে বড় লাগে। সেই গান আমি সিলেটে গেয়েছিলাম, খাশ সিলেটিদের মাঝখানে। ওঁরা বলেন, এই গান সিলেটের হলো কি না সেটা আমরা ভাবছি না। গানটা শুনে ভারি আরাম হচ্ছে। আমি কিছুটা অনুমোদন পেয়ে যাই। কিন্তু আমি এ-ও জানি ঝুন শুনলে তার নিজের মতন করে নিতে পারবে না আমার এই গাওয়া; বলবে, হলো না। কালিকা শুনলেও হয়ত তা-ই বলতো। অপরাজিতাও হয়ত তাই বলবেন। হয়ত আমি ওদের সামনে গানটা গাইবোও না, কারণ গান তো একটা সম্পর্কের মতন। শ্রোতা নিলে, ভিতরে নিলে, খোলা মনে নিলে তবেই গান হয়। তখনই গান যথাযথভাবে ‘উচ্চারণ’ করা যায়–you can utter the song।

উচ্চারণের আরো একটা দিক আছে। আমরা যখন চন্দ্রাবতী রায় বর্মন এবং সুষমা দাশের রেকর্ডিং করতাম সিলেটে, ২০০৬ থেকে ২০১৩–ঐ সময়টা, তখন বার বার শুনতে পেতাম সুনামগঞ্জের এই দুই সত্তরোর্দ্ধ শিল্পীর উচ্চারণের ভিন্নতা। আমাদের ট্র্যাভেলিং আর্কাইভ রেকর্ডস-এর প্রথম অ্যালবাম, Chandrabati Roy Barman and Sushoma Das: Field Recordings from Sylhet-এ ‘নীলমণি আজ দিব না মায়ে গুষ্ঠেতে’ শুনলেই তফাতটা ধরা যায়। (দ্রষ্টব্য: http://www.travellingarchiverecords.com/) একই অঞ্চল থেকে আসা, তবু স্রেফ ব্যক্তিগত ইতিহাসের তফাতে গায়ন কত ভিন্ন। উচ্চারণের ভিন্নতা এমনকি দিদি সুষমা এবং ছোটভাই রামকানাই দাশের মধ্যেও শুনেছি আমরা। রামকানাই দাশের মনে ছোটবেলা থেকে ছিল বাহিরের টান, তিনি লিখে গেছেন কেমন শিশুকালেই রেডিওতে শুদ্ধ কল্যাণে খেয়ালের ভিতরে নিজের গ্রামের মেয়েদের সুর করে শোক করার ধ্বনি শুনতে পেয়েছিলেন। (রামকানাই দাশ, সঙ্গীত ও আমার জীবন। ঢাকা: নবযুগ প্রকাশনী, ২০১১)। ফলে, ক্রমে ক্রমে তাঁর গান, গানের উচ্চারণ আর গ্রামের শব্দজগতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। অন্যদিকে দিদি সুষমা থেকে গেছেন গ্রামের পুরনো বট গাছের মতন। এক মায়ের পেটের সন্তান হবার পরেও, এক হাওরের বাতাসে বড় হবার পরেও উচ্চারণ যদি আলাদা হতে পারে, তাহলে–লন্ডন-প্রবাসী সিলেটের সৈয়দপুরের মানুষ আহমেদ ময়েজের ভাষা থেকে ধার করে বলি–আমরা তো ‘নগরে নগরে ঘোরা মানুষ’ (‘নগরবাসী রে, আমি নগরে নগরে ঘুরিলাম/নগরে নগরে ঘুরি মীমেরে খুঁজিলাম/পাইলে তারে নয়ন জলে চরণ ধুয়াইতাম’–মজির উদ্দীন।), শিকড় থেকে সেই কোন জন্মে বিচ্ছিন্ন, শিকড় আদৌ কোথায় ছিল মনে করতে পারি না। আমাদের provenance তাহলে কী? আমাদের উচ্চারণই বা কী হবে?

আমাকে গত বছর শাহ আবদুল করিমের জন্ম শতবর্ষের অনুষ্ঠানে সিলেটে ডেকেছিল। আমি সেখানে সুকান্তর করা আমাদের ট্র্যাভেলিং আর্কাইভের অনেকগুলি গান বাজিয়েছিলাম। কতজন কতভাবে করিম শাহ’র গান গেয়েছেন। শুধু করিম শাহ-তেই কত আলাদা হয়ে যাই আমরা। কোথায় শিশু মিয়া আর কোথায় ধরণী আর কোথায় লন্ডন-স্থিত গানের দল ‘ক্ষ’! তারপর তো আরো কত কবি, কত গান, কত গায়ন! কত রকমের! সুনমগঞ্জের শাল্লায় সাধুশ্রী গ্রামে হুরি গান হচ্ছিল, ‘আসো রে শ্রীনন্দের দুলাল,’ প্রথম লাইন; তারপরই গাইছেন ‘আও রে কানহাইয়া লাল’। এই ‘আও রে কানহাইয়া লাল’–কোথা থেকে এলো এমন উচ্চারণ? পুণায় একটা প্রেজেন্টেশনের সময় একজন এই গান শুনে বলেছিলেন, এতে ধামার গানের ভাব এমন ভাবে শুনতে পাওয়া যায়! এই যে বিভিন্নতা, একে বিস্তার বলে ভাবা যায় না? এই যে গান এখান থেকে ওখানে চলে যাচ্ছে, কেউ গান নিয়ে আসছে, কেউ নিয়ে যাচ্ছে, এতে ব্যাপ্তি দেখতে পাবো না আমরা? ভয় পাবো? সত্যি কথা বলতে কি, এইটুকু মেনে নিলে কিন্তু গানের রস একটু বেশিই পাওয়া যায়। আমাদের এই রেকর্ডিং সেশনে http://www.thetravellingarchive.org/record-session/shafiks-teashop-ghungiar-gaon-bazar-shalla-sunamganj-sylhet-16-august-2012-linkon-and-shishu-mia/, একই করিম শাহ’র গান একই গ্রামের চায়ের দোকানে কেমন নানা ভাবে গাওয়া হয়েছিল একদিন, সেই গল্পটা ধরা আছে। শুনতে মনে হয় ভালই লাগবে। কোনো একজন ব্যক্তি সিলেটকে ধারণ করতেন–এমন কথা কেউ যদি বলে থাকে তাহলে বলেছে। তাতে কিছু এসে যায় না। সত্যিই কি আর কোনো একজন মানুষ একটা বৃহৎ, জটিল এবং খণ্ডিত মানচিত্রকে তার নিজের মধ্যে ধারণ করতে পারে? ‘দেশ’ জিনিসটা কি এতই সহজ যে চাইলেই ধরা দেবে?

শেষে সুষমা মাসিমার একটা গল্প বলি। একবার সিলেট রেডিও স্টেশনে গাইতে গেছেন, শুনছেন একটি কম বয়সী ছেলে ‘তুমি সারা নিশি কই ছিলায় রে রসরাজ, গুপির মনচুরা’ গাইছে। একটা শব্দ সেখানে ছিল, দণ্ডবৎ। সেই ছেলেটি গাইছিল দন্তপথ। মাসিমার বলছিলেন, গাইবে যদি, একটু জেনে গাইবে না? ঠিকই তো! জানার মানুষ আর জানানোর মানুষ সত্যিই কমে যাচ্ছে। কেউ না জেনে গাইলেও তা নিয়ে ভাবার সময় তো নেই। মাসিমা খেয়াল করলেন। রেডিও স্টেশনে কেউ একজন সেই ছেলেটিকে বললো, যাইয়া শিখ্যা লইয়ো।

সেদিন করিম শাহ’র শতবর্ষের অনুষ্ঠানে অসংখ্য শিল্পী গান গেয়েছিলেন। মাসিমাও গেয়েছিলেন। এক হল ভর্তি মানুষ, তাঁদের বেশির ভাগই হয়ত বাড়ি গিয়ে ‘সারেগামা’ দেখবেন, তবু তাঁরাও তো সেদিন উঠে দাঁড়িয়ে মাসিমাকে সম্মান জানিয়েছিলেন। ওরকমভাবে গাইবার মানুষ কমই হয়। কিন্তু একেবারে নেই, তাও না। আর তেমন তেমন হলে মানুষ মুড়ি মিছরির তফাত করতে পারে না, এমনও আসলে না। পারে কিন্তু এখনও।

১৭-২০ মার্চ ২০১৭, ২৬ এইচ, কলকাতা।